অনেক
আগে X-Men দেখেছিলাম,
মনে পড়ে। সেখানে Cyclops নামে এক হিরো ছিল, সাধারণ অবস্থায়
নাম স্কট। চোখ থেকে বিধ্বংসী বিম মেরে সব উড়িয়ে দিত। ছোটকালে তাকে খুব ভালো লাগত।
বড়কালে
রঙের দুনিয়ায় কোন আগ্রহ না থাকলেও, ইতিহাসের সাদাকালো পাতার এক স্কট কে আরও অনেক
বেশি ভালো লাগে। না চোখ দিয়ে বিম মেরে সবকিছু উড়িয়ে দিতেন না, তবে এই চোখ দিয়ে
লিখা দেখে দেখে ভাষান্তর করতেন তিনি, জ্ঞানহীনতার চরম অভিশাপ থেকে ইয়োরোপকে মুক্ত
করার প্রচেষ্টায়। অ্যারাবিক
থেকে ল্যাটিন।
মাইকেল স্কট কাজ করতেন ফ্রেডেরিক টু এর দরবারে, যিনি University of
Naples এর প্রতিষ্ঠাতা। এটি ইয়োরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যা একটি
নির্দিষ্ট সময়ে একটি নির্দিষ্ট চার্টার দ্বারা স্থাপিত হয়েছিল। এই ফ্রেডেরিক টু,
ছিলেন আধা-মুসলিম। তিনি সবসময় মুসলিমদের মতো পোশাক পড়ে থাকতেন, জোব্বা টাইপের কিছু
একটা। সেটি ছিল তার জন্য সর্বোচ্চ স্টাইল। সভ্যদের ফ্যাশন। তার জোব্বায় আরবিতে
লেখা থাকত ‘একজন শক্তিশালী আমির’। ক্লাসিকাল অ্যারাবিকে ছিল তার মাস্টারি, তার
বডিগার্ড সব ছিল মুসলিম। মুসলিমদের সাথে তার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার জন্য চার্চ তাকে
ধর্মদ্রোহী বলে ঘোষণা করে।
তাহলে আমরা চার্চে এসে গেলাম। মুসলিম ও খৃষ্টানদের আদায়
কাঁচকলায় সম্পর্ক ইতিহাসে অত্যন্ত দৃষ্টিগোচর*। অদ্ভুতভাবে সত্য, খৃষ্টান বিশ্বে সর্বপ্রথম ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ
ঘটান একজন পোপঃ গারবার্ট ড’অওরিল্যাক বা পোপ সিল্ভেস্টার টু। এর জন্য অবশ্য তাকে
‘শয়তানের চ্যালা’ গালি শুনতে হয়। ভাবতে পারেন, খৃষ্টানরা নিজেদের পোপদের সাথেও এমন
করে নাকি? না আসলে বেশি একটা তাজ্জব হওয়ার কিছু নেই। সারভেটাস নামের আরেকজন
পাদ্রীকে তো বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার জন্য আগুনেই জ্বালিয়ে দেয়া হয়।
উপরের মানুষদের না চিনলেও, রজার বেকন কে নিশ্চয়ই চিনে
থাকবেন। যাকে ভুলভাবে ‘পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবক্তা’ বলা হয়। তবে যিনি
ঠিকভাবেই বলেছিলেন, আরবি জ্ঞান, সত্য জ্ঞান অর্জনের একমাত্র পথ।
টমাস অ্যাকুইনাস, পাশ্চাত্য দর্শন ও নৈতিকতার উপর রয়েছে
যার বিশাল প্রভাব...
এদের সাথে রয়েছেন মোরলে-এর ড্যানিয়েল, পেট্রাস আলফন্সি,
অ্যালবার্টাস ম্যাগনাস (Albert the Great), রবার্ট গ্রসেটেস্ট,
ক্রিমোনা-এর জেরার্ড, নিকোলাস কোপার্নিকাস এবং অন্যরা, প্রত্যেকে জোনাথান লিয়ন্সের
The House of Wisdom বইয়ের এক একজন হিরো, যাদের সবচেয়ে বড়
চ্যাম্পিয়ন, ইংল্যান্ডের প্রথম বিজ্ঞানীঃ বাথ-এর অ্যাডেলার্ড।
১২শ শতকের অ্যাডেলার্ড জ্ঞানের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে
সিদ্ধান্ত নিলেন, পৃথিবী পচে গেছে। তিনি বলেছিলেন, প্রাচীনরা স্পষ্টভাষী আর
আধুনিকরা বোবা। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আধুনিকদের’ দ্বারা উদ্ঘাটিত কোন কিছুই
মানা যাবে না। তার কথার যৌক্তিকতা বোঝা যায়, ফ্রান্সে ঐ সময় একটি গণিত
পাঠ্যবইয়ে একদম মৌলিক বিষয়াদিও ছিল ভুলে ভরপুর। অবস্থা এতই খারাপ ছিল, যে মানুষ
সময় ও ক্যালেন্ডারের হিসাবও রাখতে পারছিল না। যদিও খ্রিস্টবাদের পয়েন্ট অফ ভিউ
থেকে সময়ের হিসাব রাখা একটি গম্ভির বিষয় ছিল, তবু তারা পারছিল না। সে সময়ে তার
মতানুযায়ী, ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞান বোরিং আর অ্যারাবিক বিজ্ঞান মজা। এডেলার্ডের বর্ণনা
ভঙ্গিঃ মনে করবেন না যে আমি এসব (উঁচুমানের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা) নিজের থেকে বলছি,
বরং আমি শুধুই আরবদের (মুসলিমদের) মত ব্যাখ্যা করছি।
পড়ালেখা শেষে যখন তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন, তখন সেখানের
অবস্থা বর্ণনা করেনঃ রাজপুত্রগণ জংলী, পাদ্রীরা মাদকাসক্ত, আইনের কর্তৃত্বশালীরা
ঘুষখোর, জ্ঞানের অভিভাবকেরা অনির্ভরযোগ্য, তাদের ক্লায়েন্টরা লোভী সুবিধাবাদী, প্রতিশ্রুতিদানকারীরা
মিথ্যাবাদী, বন্ধুসব হিংসুক, সাথে দিয়ে প্রায় প্রত্যেকেই অত্যন্ত আশাবাদী
এই বাথ-এর অ্যাডেলার্ড, যিনি তার সমসাময়িক শিক্ষার চরম
বিরুদ্ধবাদী ছিলেন, শেষ জীবনে তার প্রোপোনেন্ট হয়ে যান। কারণ তখন মুসলিমদের থেকে
আনা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠা পাচ্ছিল। তার বিশ্বাস ছিল, শুধুমাত্র সে জ্ঞানই এই ধরার মানুষদের
উন্নত ও স্বাধীন করে তুলতে পারবে।
“আমার আরব মাস্টারদের থেকে একটি জিনিস আমি শিখেছি, যে
যুক্তিকে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিতে হবে। কিন্তু তুমি, তুমি একটি রশির পিছে পিছে
ঘুরো, তোমায় একজন টেনে নিয়ে যায় গলায় রশি বেধে এবং তুমি তার পিছে পিছে যাও।
অন্ধবিশ্বাস কে এরকম রশির সাথে তুলনা করা ছাড়া আর কি-ই বা করা যেতে পারে?
নিম্নমানের প্রাণীরা যেমন একটি রশি বা কাঁঠির অনুসরণ করে; তারা জানে না তাদের
কোথায় নেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে তাদের কিছুই যায়-আসে না, তারা শুধু অন্ধভাবে ছোটে। এমন
নিম্নমানের লেখাসমূহের অনুসরণে কম মানুষ বিপথগামী হয় নি; কেননা তোমরা যে কোন
কিছুকে, তা সে যেখান থেকেই আসুক না কেন, সত্য ধরে নেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী”
The House of Wisdom: How the Arabs Transformed Western Civilization
বইটি জ্ঞানের ক্রমোন্নতির গল্প বলে। এই চমৎকার
ভাবনা-জাগানো বইয়ে জোনাথান লিয়ন্স মুসলিমদের তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। পাঠকদের
স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মুসলিমদের অবদানের কথা। ভিতরে অবশ্য, মুসলিমদের
কথা তুলনামূলক কমই এসেছে, কেননা এই বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য, ‘কিভাবে মুসলিমরা
পশ্চিমকে পাল্টে দেয়’।
লেখক জোনাথান লিয়ন্স দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, যে বর্তমানে
সভ্যতা ও বিজ্ঞানে মুসলিমরা কি অবদান রেখেছে তা মানুষ মনে রাখে নি। আর প্রত্যেকে
এও ভুলে গিয়েছে যে ইয়োরোপের অবস্থা এক সময় কত্ত খারাপ ছিল। মাত্র ২০০ বছর
(সর্বোচ্চ ৪০০) এর উচ্চতার কারণে সকলে বিশ্বাস করে যে ইয়োরোপই সভ্যতার মূল এবং
বিজ্ঞানের ৯৯.৯৯ শতাংশ কাজ পশ্চিমেই হয়েছে। কিন্তু এমন ইউরোসেন্ট্রিক ভাবনা খুবই
ভুল।
মাঝে লাইন টানার জন্য ভালো একটি উদাহরণ হতে পারে এটিঃ
ইয়োরোপের প্রথম অবজারভেটরি স্থাপিত হয়েছিল মুসলিম অ্যাস্ট্রনমার জাবির ইবন আফলাহ
এর সুপারভিশনে। মুসলিমদের থেকে স্পেইন ছিনিয়ে নেওয়ার পর অসভ্য স্প্যানিশরা বুঝে
উঠতে পারেনি ‘জিনিসটা দিয়ে কি করা যায়’ অতঃপর তাকে একটি ঘণ্টা বাজানোর ইমারতে
পরিণত করে দেয়!
উপরে যাদের কথা বলেছি, তাদের দ্বারা ইয়োরোপে বিজ্ঞানযাত্রা
শুরু হয়। তারা শত সমালোচনার মুখে পড়েও জ্ঞানচর্চাকে উপরে তুলে দেন। তাদের কারণেই
পরবর্তীতে গ্যালিলেও, নিউটন, ফ্যারাডে, আইনস্টাইনরা বেরিয়ে আসে। আপনি যদি তাসের
ঘরের উপর থেকে কয়েকটি কার্ড তুলে নেন, বেশি একটা সমস্যা না; কিন্তু যদি নিচ থেকে
কয়েকটি তাস সরান, পুরো ঘরটিই ভেঙ্গে পড়বে।
উপরে উল্লেখিত নায়কদের কারণেই মূলত ইয়োরোপে রেনেসাঁর
আবির্ভাব হয়। আর এরা প্রত্যেকে, জ্ঞান অর্জন করেছেন মুসলিমদের লিখিত অ্যারাবিক
বইসমূহ থেকে। আইনস্টাইন জন্মগ্রহণ না করলেও, এক না এক সময়, ২০০-৩০০ বছর পর হলেও
কেউ না কেউ তার জায়গা পূরণ করেই দিত, কিন্তু প্রথমে বাথ-এর অ্যাডেলার্ড জ্ঞানকে
তুলে দিয়ে না গেলে, তার মতো অন্যরা ইয়োরোপে জ্ঞানের পরিবেশ সৃষ্টি না করলে
আইনস্টাইন এর মত কেউ আসত না আর কখনো।
বইটি শুধু ভুলে যাওয়া মুসলিম অবদান কেই সকলের সামনে তুলে
ধরে না; সঙ্গে দিয়ে জানায় ইয়োরোপের প্রথমদিককার বিজ্ঞানীদের স্মরণ করার আহ্বান।
বইটির সামারি এক লাইনে ফুটে উঠে ফ্রেঞ্চ স্কলার লমবার্ড এর
বক্তব্যেঃ
ইসলাম পশ্চিমকে তার জংলীরূপী কালরাত্রী হতে টেনে বের করে
আনে।
জোনাথান লিয়ন্স ঠিক এই জিনিসটিই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন তার
বইটির মধ্যে। তার বই একটি স্মোকিং গান। লেখকের বিশ্বাস, Muslims
Invented the West.
*একই লেখকের Islam Through Western Eyes এই ব্যাপারে জানার জন্য একটি উৎকৃষ্ট বই

0 Comments